করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে একসময় স্কুল-কলেজের প্রবেশপথে বসানো হয়েছিল হাত ধোয়ার বেসিন, পানির ড্রাম ও ট্যাপ। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রবেশের আগে এবং টিফিন বা খাবার খাওয়ার আগে হাত ধোয়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে শিক্ষক-কর্মচারীরাও ছিলেন বেশ তৎপর। কিন্তু মহামারির জরুরি পরিস্থিতি কেটে যাওয়ার পর অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানেই সেই উদ্যোগের ধারাবাহিকতা ধরে রাখা যায়নি। কোথাও বেসিন থাকলেও পানি নেই, কোথাও ট্যাপ অকেজো, আবার কোথাও পানি পাওয়া গেলেও মিলছে না সাবান বা হ্যান্ডওয়াশ।
আজ ১৫ অক্টোবর, ‘বিশ্ব হাত ধোয়া দিবস’ উদযাপিত হলেও রাজধানী ঢাকা ও দেশের বিভিন্ন এলাকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে হাত ধোয়ার সুযোগ ও উপকরণ সরবরাহে চরম ঘাটতির বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। করোনাকালে স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য নেওয়া উদ্যোগগুলোর অনেকগুলোই এখন নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে কার্যকারিতা হারিয়েছে। এতে শিক্ষার্থীদের হাত ধোয়ার সুযোগ যেমন ব্যাহত হচ্ছে, তেমনি স্বাস্থ্যবিধি চর্চার ধারাবাহিকতা নিয়েও বড় ধরনের প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
করোনাকালে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে হাত ধোয়ার যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, তদারকি ও আলাদা বাজেট বরাদ্দের অভাবে তা এখন প্রায় অকার্যকর। অনেক স্কুলে বেসিন থাকলেও পানি বা সাবান নেই, যা শিক্ষার্থীদের নিয়মিত স্বাস্থ্যবিধি চর্চায় বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা ডায়রিয়াসহ নানা সংক্রামক রোগের মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়ছে। তাই শুধু সাময়িক নির্দেশনা নয়, বরং স্থায়ী রক্ষণাবেক্ষণ ও নিয়মিত উপকরণের সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি
করোনার সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে রাখতে দীর্ঘদিন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকার পর শ্রেণিকক্ষে পাঠদান শুরুর সময় শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় নানা পদক্ষেপ নেওয়া হয়। সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে কোথাও বেসিন, পানির ড্রাম ও ট্যাপ বসানো হয়; আবার কোথাও সরবরাহ করা হয় সাবান, হ্যান্ডওয়াশ ও হ্যান্ড স্যানিটাইজার। নিয়মিত হাত ধোয়ার অভ্যাস গড়ে তুলতেও শিক্ষার্থীদের প্রতিনিয়ত উৎসাহিত করা হতো। তবে, জরুরি পরিস্থিতিতে নেওয়া এসব উদ্যোগের বহু ক্ষেত্রেই দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
রাজধানীর বড় ও নামী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতেও হাত ধোয়ার উপকরণ নিয়মিত সরবরাহে চরম ঘাটতির অভিযোগ রয়েছে। কোথাও বেসিন ও পানির ব্যবস্থা থাকলেও সাবান বা হ্যান্ডওয়াশ পাওয়া যায় না সবসময়। ফলে অবকাঠামো দৃশ্যমান থাকলেও শিক্ষার্থীদের হাত ধোয়ার সুযোগ কার্যকর হচ্ছে না।
ঢাকা কলেজের উচ্চমাধ্যমিক শ্রেণির শিক্ষার্থী আশিকুর রহমান বলেন, ‘কলেজ ক্যাম্পাসে হাত ধোয়ার জন্য বেসিন ও পানির ব্যবস্থা থাকলেও সাবান বা হ্যান্ডওয়াশ পাওয়া যায় না। হাত ধোয়ার প্রয়োজন হলে সাধারণ পানি ব্যবহার করতে হয়। ক্যাম্পাসে সাবান বা হ্যান্ডওয়াশের সুব্যবস্থা থাকলে আমাদের জন্য হাত পরিষ্কার রাখা সহজ হতো।’
ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থী সায়মা বিনতে আলীও সাবানের অনিয়মিত সরবরাহের কথা জানায়। সে বলে, ‘স্কুলে মাঝে মধ্যে সাবান পাওয়া গেলেও বেশির ভাগ সময় তা থাকে না। এ কারণে হাত ধোয়ার প্রয়োজন হলে নিজের সঙ্গে রাখা ছোট হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যবহার করতে হয়।’
সরকারি বিজ্ঞান কলেজের শিক্ষার্থী রবিউল ইসলাম বলেন, ‘কলেজে পানির সংকট না থাকলেও হাত ধোয়ার জন্য সাবান বা হ্যান্ডওয়াশের ব্যবস্থা নেই। ফলে শিক্ষার্থীদের শুধু পানি দিয়েই হাত পরিষ্কার করতে হচ্ছে। অথচ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে পানি ব্যবহারের পাশাপাশি সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার সুযোগ থাকা অত্যন্ত জরুরি।’
রাজধানীর বাইরে গ্রাম ও মফস্বলের অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরিস্থিতি আরও জটিল। সাভার, গাজীপুর ও মানিকগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে পাওয়া তথ্যে হাত ধোয়ার অবকাঠামো সম্পূর্ণ অকার্যকর হয়ে পড়া এবং সাবান-পানির চরম অনিয়মিত সরবরাহের বিষয়টি উঠে এসেছে। কোথাও বেসিন থাকলেও পানির সংযোগ বিচ্ছিন্ন, কোথাও ট্যাপ ভেঙে নষ্ট হয়ে আছে, আবার কোথাও পানি থাকলেও সাবান পাওয়া যায় না। ফলে নামকাওয়াস্তে হাত ধোয়ার ব্যবস্থা থাকলেও তা শিক্ষার্থীদের নিয়মিত ব্যবহারের উপযোগী থাকছে না।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ও ইউনিসেফের যৌথ প্রতিবেদনেও বাংলাদেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মৌলিক স্বাস্থ্যবিধি সুবিধার ঘাটতির চিত্র উঠে এসেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের ৪৪ শতাংশ স্কুলে পানি ও সাবানসহ মৌলিক হাত ধোয়ার সুবিধা ছিল না। নিরাপদ পানির সুবিধা ছিল না ১৯ শতাংশ স্কুলে। আর ৭ শতাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পানি, শৌচাগার ও হাত ধোয়ার কোনো সুবিধাই ছিল না।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে হাত ধোয়ার ব্যবস্থা না থাকায় অভিভাবকদের মধ্যেও তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। তাদের মতে, শিক্ষার্থীরা দিনের একটি বড় অংশ স্কুলে কাটায়। এ সময় তারা শ্রেণিকক্ষ ও শৌচাগার ব্যবহার করে, সহপাঠীদের সঙ্গে খেলাধুলা ও মেলামেশা করে। খাবার খাওয়ার আগে ও শৌচাগার ব্যবহারের পর হাত পরিষ্কার করার সুযোগ না থাকলে মারাত্মক জীবাণুর সংস্পর্শে আসার ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। তাই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে হাত ধোয়ার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা শিশুদের দৈনন্দিন স্বাস্থ্য সুরক্ষারই এক অপরিহার্য অংশ।
মতিঝিল এলাকার অভিভাবক ফরিদা পারভীন বলেন, ‘করোনাকালে হাত ধোয়া ও পরিচ্ছন্নতা নিয়ে যে সচেতনতা তৈরি হয়েছিল, তা স্থায়ী হবে বলে আশা করেছিলাম। কিন্তু এখন অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এ বিষয়ে আগের মতো কোনো তদারকিই দেখা যায় না। শিশুরা বাইরে খেলাধুলার পর অপরিষ্কার হাতে টিফিন খায়, যা নিয়ে অভিভাবক হিসেবে আমরা সব সময় উদ্বেগে থাকি।’
